দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কাগজে-কলমে ১১০ শিক্ষার্থী। কিন্তু সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকেও পাওয়া যায়নি। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চে ছাগলের মলমূত্র, কাদা ও ময়লা-আবর্জনা। বিভিন্ন জায়গায় জাল বুনেছে মাকড়সা। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য থাকা শ্রেণিকক্ষগুলো যেন পরিণত হয়েছে ছাগলের আশ্রয়স্থলে।
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের বাদুরতলা গ্রামের পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে কাগজে-কলমে শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত ক্লাস হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকসহ অফিস কক্ষে তালা ঝুলছে। বাইরে টাঙানো রয়েছে জাতীয় পতাকা। শ্রেণিকক্ষগুলোর পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। বেঞ্চগুলো এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। বেঞ্চের ওপর ও মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে ছাগলের মলমূত্র। জমে আছে কাদা ও ময়লা-আবর্জনা। বিভিন্ন স্থানে মাকড়সার জালও দেখা যায়। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে অবাধে বিচরণ করছে ছাগল।
একটি শ্রেণিকক্ষের হোয়াইট বোর্ডে ২০২৪ ও ২০২৫ সাল লেখা রয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময় কোনো একদিন বোর্ডে লেখা হয়েছিল। এরপর সেখানে নিয়মিত পাঠদান হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছর শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
সকাল গড়িয়ে বেলা ১১টার পর বিদ্যালয়ে আসেন সহকারী শিক্ষক অনামিকা মৃর্ত ও রতন লাল মিস্ত্রি। এত দেরিতে বিদ্যালয়ে আসার কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে তারা প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের ফোন করে সাংবাদিক আসার কথা জানান এবং বিদ্যালয়ে আসতে বলেন।
প্রায় দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধা। তবে অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের কাউকে তখন বিদ্যালয়ে দেখা যায়নি।
অফিস কক্ষে শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে জানান, হাজিরা খাতা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের ঘরে রাখা রয়েছে। পরে সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন তারা। একপর্যায়ে সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধার মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক এই প্রতিবেদককে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যালয়টি এভাবে চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। স্থানীয় কোনো ছেলে-মেয়ে বিদ্যালয়টিতে পড়তে আসে না বলেও দাবি তাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবু বিভিন্ন এলাকার পড়াশোনা না করা ছেলে-মেয়েদের টাকার বিনিময়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি দেখান। অডিট বা কোনো অনুষ্ঠান হলে ঝালকাঠি সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে দুইটি অটোরিকশায় করে টাকা দিয়ে ছেলে-মেয়েদের এনে শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানো হয়। পরীক্ষার সময়ও মাঝেমধ্যে বাইরে থেকে শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষায় বসানো হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবুর পরিবারের পাঁচজন সদস্য বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে কর্মরত রয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক নিজেদের পছন্দের লোকজন দিয়ে বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন।
এ ছাড়া শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করায় কোনো সভাপতি মাসিক বেতনের শিটে স্বাক্ষর না করলে তাঁর স্বাক্ষর জাল করে নিজেরাই স্বাক্ষর দিয়ে বেতনের টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বর্তমানে বিদ্যালয়ের সভাপতি পদে রয়েছেন প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর বড় ভাই মনিরুজ্জামানের ছেলে মিজানুর রহমান পারভেজ। অর্থাৎ তিনি নিজের ভাইয়ের ছেলেকে সভাপতি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সভাপতি নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এসে বাসায় বসেই স্বাক্ষর করেন। এভাবে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয় আরাফাত, আসমা বেগমসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, বিদ্যালয়ে মাঝে মাঝে পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা আসে। এ ছাড়া অন্য সময়ে শিক্ষার্থীদের দেখা যায় না। তবে ছাগল নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে আসে এবং বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। শিক্ষকরাও প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসেন না বলে দাবি তাদের।
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি হাসনাইন তালুকদার দিবস বলেন, ২০০৬ সালের দিকে তাঁকে বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হয়। কিছুদিন পর তিনি জানতে পারেন, বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী নেই। তাঁর দাবি, বিদ্যালয়ে গেলে শিক্ষকরা পাশের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এনে শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে রাখতেন।
তিনি আরও বলেন, একদিন কাউকে না জানিয়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেন, স্কুল তালাবদ্ধ। পরে ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তাঁর স্বাক্ষর জাল করে মিটিংয়ের রেজুলেশন তৈরি করা হয় এবং সরকারের কাছ থেকে অনুদানের জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়। ২০০৮ সালে ওই অনুদানের অর্থ উত্তোলনের সময় বিষয়টি তাঁর কাছে ধরা পড়ে।
হাসনাইন তালুকদার দিবস বলেন, সব মিলিয়ে সীমাহীন দুর্নীতির বিষয়টি বুঝতে পেরে তৎকালীন জেলা প্রশাসক হরিপ্রসাদ পালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ করেন রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। তিনি বলেন, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তাঁকে বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হয়েছিল। তখন তিনি মঠবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন।
জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না, ক্লাসও হতো না। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে কাউকে পাওয়া যেত না। পরে শিক্ষক, কর্মচারী ও স্থানীয়দের নিয়ে সভা করে নিয়মিত পাঠদান ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কথা বলেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ায় তাঁকে সভাপতি করা হয়েছিল, যাতে তিনি বিদ্যালয়কে আর্থিক সহযোগিতা করতে পারেন—এমন বিষয় তিনি তখন বুঝতে পারেন। বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমেও চেষ্টা করেন। কিন্তু কারও কথা না শোনায় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর আগেই ২০১৫ সালে পদত্যাগ করেন।
বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান ওরফে পারভেজের কাছে বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ও বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তিনি সাংবাদিককে জবাব দিতে বাধ্য নন। শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে আসেন কি না এবং ক্লাস হয় কি না, তা জানতে তিনি কেন বিদ্যালয়ে গেছেন—এমন প্রশ্নও করেন তিনি।
শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতনের শিটে টাকার বিনিময়ে স্বাক্ষর করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার না করে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কাছে কথা বলবেন বলে জানান।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী না এলেও কাগজে-কলমে ১১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
তিনি বলেন, মাঝে মাঝে ঝালকাঠি শহর থেকে দুইটি অটোরিকশায় শিক্ষার্থী এনে বিদ্যালয়ে ক্লাস করানো হয়। জেলা সদর থেকে বিদ্যালয়টি ২০ কিলোমিটারের বেশি দূরে হওয়া সত্ত্বেও শহর থেকে শিক্ষার্থী এনে ক্লাস করানোর কারণ জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন, স্থানীয় চার-পাঁচজন শিক্ষার্থী আসে, অন্যরা আসে না। এ কারণে ঝালকাঠি থেকে শিক্ষার্থী নিয়ে আসা হয়।
রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, বিদ্যালয়ের বিষয়টি জানতে পেরে প্রধান শিক্ষককে লিখিত জবাব চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ বিদ্যালয়টিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এরপর পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে এবং প্রধান শিক্ষকের জবাব সন্তোষজনক না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি বলেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একদিকে বিদ্যালয়ের কাগজে-কলমে ১১০ শিক্ষার্থী, অন্যদিকে সরেজমিনে একজন শিক্ষার্থীরও উপস্থিতি নেই। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে ছাগলের অবস্থান, দীর্ঘদিন পাঠদান না হওয়ার অভিযোগ, বাইরে থেকে শিক্ষার্থী এনে উপস্থিতি দেখানো, হাজিরা খাতা দেখাতে না পারা এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বিদ্যালয় পরিচালিত হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সরকারি অর্থে পরিচালিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কার্যক্রম, শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং সরকারি অর্থের ব্যবহারের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এমএস/